শরীরের ওজনের কতটা বংশগত?
মানুষে মানুষে ওজনের পার্থক্যের বড় একটা অংশ জিন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। যমজদের নিয়ে করা গবেষণার একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বডি মাস ইনডেক্সের (BMI) বংশগতির হার মোটামুটি 47% থেকে 90%। পরিবারভিত্তিক গবেষণায় হিসাবটা কম এসেছে, প্রায় 24% থেকে 81%।
বংশগতির হার সহজেই ভুল বোঝা যায়। এটি একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে একটি জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে পার্থক্য বোঝায়। আপনার নিজের ওজনের কত ভাগ জিন থেকে এসেছে, তা এই সংখ্যা বলে না।
এর মানে এটাও নয় যে আপনার ওজন বদলানো যায় না। গত কয়েক দশকে আমাদের জিন প্রায় বদলায়নি, অথচ সারা পৃথিবীতে স্থূলতা অনেক বেড়েছে। বদলেছে আমাদের চারপাশের পরিবেশ (দেখুন খাদ্য পরিবেশ ও স্থূলতা)। ওই পরিবেশে কার ওজন বাড়ার সম্ভাবনা বেশি, সেটাই মূলত জিন ঠিক করে।
একটি জিনের কারণে হওয়া বিরল স্থূলতা কী?
খুব অল্প কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মাত্র একটি জিনের পরিবর্তনই তীব্র স্থূলতা তৈরি করতে পারে, যা সাধারণত শৈশবের একেবারে শুরুতে দেখা দেয়। একে বলে মনোজেনিক স্থূলতা। এই অবস্থাগুলো মূলত লেপটিন–মেলানোকর্টিন পথকে প্রভাবিত করে, যা মস্তিষ্কে খিদে নিয়ন্ত্রণের একটি সংকেত-ব্যবস্থা।
- MC4R-এর ঘাটতি: মেলানোকর্টিন-4 রিসেপ্টর (MC4R) জিনের পরিবর্তন মনোজেনিক স্থূলতার সবচেয়ে সাধারণ কারণ। কোন জনগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণা হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে, শৈশবের শুরুতেই তীব্র স্থূলতা আছে এমন শিশুদের মোটামুটি 0.5% থেকে 5.8%-এর মধ্যে এটি পাওয়া যায়।
- জন্মগত লেপটিন-ঘাটতি: শরীর লেপটিন হরমোন তৈরি করতে পারে না। শৈশব থেকেই মানুষটি সারাক্ষণ প্রচণ্ড খিদে অনুভব করেন। এটি অত্যন্ত বিরল: প্রথম বর্ণনার পর থেকে সারা বিশ্বে হাতে গোনা কয়েকটি ঘটনা জানা গেছে। কৃত্রিমভাবে তৈরি লেপটিন, মেট্রেলেপটিন দিয়ে চিকিৎসা করলে ওজন স্বাস্থ্যকর সীমায় ফিরে আসতে পারে।
- অন্যান্য বিরল ধরন: POMC, PCSK1 ও লেপটিন রিসেপ্টর (LEPR)-এর মতো জিনের পরিবর্তন, এবং বার্ডেট-বিডল সিনড্রোমের মতো সিনড্রোম। যুক্তরাষ্ট্রে POMC, PCSK1 বা LEPR-ঘাটতি এবং বার্ডেট-বিডল সিনড্রোমজনিত স্থূলতার জন্য সেটমেলানোটাইড ওষুধটি অনুমোদিত। অনুমোদন ও প্রাপ্যতা দেশভেদে আলাদা।
শৈশবের একেবারে শুরুতে তীব্র স্থূলতা দেখা দিলে, বিশেষ করে সঙ্গে প্রচণ্ড খিদে বা পরিবারে একই ইতিহাস থাকলে, ডাক্তার জিনগত পরীক্ষার কথা ভাবতে পারেন। রোগনির্ণয় হলে বছরের পর বছরের কষ্টের ব্যাখ্যা মেলে, চিকিৎসার পথ ঠিক হয় আর অপরাধবোধ হালকা হয়। আরও পড়ুন শিশুদের স্থূলতা নিয়ে।
সাধারণ স্থূলতা: অনেক জিন, প্রতিটির ছোট প্রভাব
বেশির ভাগ মানুষের জিনগত ঝুঁকি আসে অনেকগুলো সাধারণ জিন-রূপভেদ থেকে, যার প্রতিটির প্রভাব খুবই সামান্য। একে বলে পলিজেনিক ঝুঁকি। লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিয়ে করা বড় জিনগত গবেষণায় জিনোমের শত শত অঞ্চল পাওয়া গেছে, যেগুলো BMI-এর সঙ্গে যুক্ত। এর অনেক জিন কাজ করে মস্তিষ্কে, ঠিক সেই খিদের পথগুলোতেই, যেখানে বিরল একক-জিনের স্থূলতা তৈরি হয়।
গবেষকেরা এই রূপভেদগুলো যোগ করে একটি পলিজেনিক স্কোর তৈরি করতে পারেন। Cell জার্নালে প্রকাশিত একটি বড় গবেষণায়, 2 মিলিয়নের বেশি জিন-রূপভেদের ভিত্তিতে তৈরি স্কোরে ওপরের 10%-এ থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের ওজন নিচের 10%-এর চেয়ে গড়ে প্রায় 13 kg (প্রায় 30 পাউন্ড) বেশি ছিল। তাঁদের তীব্র স্থূলতার সম্ভাবনাও ছিল প্রায় 25 গুণ বেশি।
তবু উঁচু স্কোর মানেই নিয়তি নয়। উঁচু স্কোরের অনেকের স্থূলতা হয় না, আবার নিচু স্কোরের অনেকের হয়।
মস্তিষ্ক কীভাবে খিদে নিয়ন্ত্রণ করে?
শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্ক, মূলত হাইপোথ্যালামাস নামের একটি অংশ। শরীরে কতটা শক্তি জমা আছে আর কতটা খাবার খাওয়া হয়েছে, এই অংশটি সারাক্ষণ সেই সংকেত পায়, তারপর খিদে, তৃপ্তি আর শক্তি খরচ সেই অনুযায়ী ঠিক করে।
| সংকেত | কোথায় তৈরি হয় | মূল প্রভাব |
|---|---|---|
| লেপটিন | চর্বি-কলা | শরীরে কতটা শক্তি জমা আছে তা মস্তিষ্ককে জানায়; মাত্রা বেশি হলে খিদে কমে |
| ঘ্রেলিন | পাকস্থলী | খাওয়ার আগে বাড়ে এবং খিদে বাড়ায় |
| GLP-1 ও পেপটাইড YY (PYY) | অন্ত্র | খাওয়ার পর নিঃসৃত হয়; পেট ভরার অনুভূতি বাড়ায় এবং পাকস্থলী খালি হওয়া ধীর করে |
| ইনসুলিন | অগ্ন্যাশয় | রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে, আর শক্তির অবস্থার খবরও মস্তিষ্কে পাঠায় |
লেপটিন মস্তিষ্কের এমন কোষে কাজ করে, যেগুলো MC4R রিসেপ্টরের মাধ্যমে বার্তাটি এগিয়ে দেয়। এই পথ দুর্বলভাবে কাজ করলে মস্তিষ্ক পেট ভরার সংকেত কম পায়। পুরস্কার ও আনন্দের সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অন্য অংশগুলোও ঠিক করে খাবার কতটা লোভনীয় লাগবে।
সেমাগ্লুটাইড ও টিরজেপাটাইডের মতো কিছু ওজন কমানোর ওষুধ GLP-1-এর মতো অন্ত্রের হরমোনের অনুকরণ করে আর এই একই মস্তিষ্ক-পথে কাজ করে। তথ্যগুলো পড়ুন ওজন কমানোর ওষুধ পাতায়।
শরীর কেন নিজের ওজন আঁকড়ে রাখে?
ওজন কমার পর শরীর এমনভাবে সাড়া দেয়, যেন শক্তির অভাব চলছে: খিদে বাড়ে, শক্তি খরচ কমে, আর ওজন আবার ওপরের দিকে ঠেলে যায়। এটি শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, শৃঙ্খলার অভাব নয়।
New England Journal of Medicine-এ প্রকাশিত অস্ট্রেলিয়ার একটি গবেষণায় 50 জন প্রাপ্তবয়স্ক 10 সপ্তাহের খুব কম-ক্যালরির ডায়েটে গড়ে প্রায় 13 kg ওজন কমান। এক বছর পরেও তাঁদের খিদের হরমোনগুলো এমনভাবে বদলে ছিল যে খিদে বাড়ে: লেপটিন কম, ঘ্রেলিন বেশি। ডায়েটের আগের তুলনায় তাঁরা বেশি খিদের কথাও জানান।
নতুন শরীরের মাপের তুলনায় শক্তি খরচও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কমে যেতে পারে। একে বলে মেটাবলিক অ্যাডাপ্টেশন বা বিপাকীয় অভিযোজন। টেলিভিশনের একটি ওজন কমানোর প্রতিযোগিতায় বিপুল ওজন কমানো 14 জনকে নিয়ে করা গবেষণায়, ছয় বছর পরেও তাঁদের বিশ্রামকালীন বিপাক প্রত্যাশার চেয়ে দিনে প্রায় 500 kcal কম ছিল।
সেটি ছিল একটি চরম পরিস্থিতি। সাধারণ জীবনে ওজন কমালে এই প্রভাব কতটা হবে, তা মানুষভেদে অনেক আলাদা।
এই প্রতিক্রিয়াগুলোই ব্যাখ্যা করে কেন ওজন কমানোর চেয়ে ধরে রাখা প্রায়ই বেশি কঠিন। স্থূলতাকে দীর্ঘমেয়াদি যত্নের প্রয়োজন এমন একটি ক্রনিক রোগ হিসেবে দেখার এটি একটি বড় কারণ। আরও পড়ুন আবার ওজন বেড়ে যাওয়া এবং চিকিৎসার পথ নিয়ে।
আপনার জন্য এর অর্থ কী
স্থূলতার শরীরবৃত্তীয় দিকটা বুঝলে আলোচনার ধরনই বদলে যায়। আপনি যদি অন্যদের চেয়ে সহজে মোটা হন, সেটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এর মানে আপনার শরীর অন্যভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।
- জিন ঝুঁকি বাড়ায় বা কমায়, তবে তারা কাজ করে আপনার পরিবেশ, ঘুম, মানসিক চাপ আর ওষুধের সঙ্গে মিলে।
- বড় অঙ্কের ওজন না কমলেও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস আপনার স্বাস্থ্যের উপকার করে।
- ভালো যত্ন আপনার শরীরের বিরুদ্ধে নয়, শরীরের সঙ্গে মিলে কাজ করে: পেট ভরিয়ে রাখে এমন ভালো খাবার, হাঁটার মতো নিয়মিত নড়াচড়া, যথেষ্ট ঘুম আর দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা। চিকিৎসার অন্য বিকল্প নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
- দোষারোপ আর লজ্জা কোনো কাজে আসে না। আরও পড়ুন ওজন নিয়ে কলঙ্ক বিষয়ে।
পরিবারে স্থূলতা থাকলে বা জীবনের খুব শুরুতেই তা দেখা দিলে ডাক্তারকে জানান। এতে তিনি আপনার পরিস্থিতি বুঝতে আর সঠিক যত্ন বেছে নিতে পারবেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
স্থূলতার জন্য কি আমার জিনগত পরীক্ষা করানো উচিত?
বেশির ভাগ মানুষের জিনগত পরীক্ষা লাগে না, কারণ সাধারণ স্থূলতা হয় অনেক জিনের ছোট ছোট প্রভাবে। পরীক্ষার কথা মূলত ভাবা হয় যখন শৈশবের একেবারে শুরুতে তীব্র স্থূলতা দেখা দেয়, বিশেষ করে প্রচণ্ড খিদে বা পরিবারে জোরালো ইতিহাস থাকলে। পরীক্ষাটা আপনার জন্য দরকারি কি না আর আপনার এলাকায় পাওয়া যায় কি না, ডাক্তার বলতে পারবেন।
বাবা-মা মোটা হলে আমিও কি মোটা হব?
ঝুঁকি বেশি, তবে নিশ্চিত নয়। পরিবারে জিনের পাশাপাশি খাওয়ার অভ্যাস, দৈনন্দিন রুটিন আর জীবনযাপনের পরিস্থিতিও ভাগ হয়। পরিবারে ইতিহাস থাকার পরেও অনেকের কখনো স্থূলতা হয় না, আর শুরুতেই সহায়তা পেলে পার্থক্য গড়া যায়।
পলিজেনিক ঝুঁকি-স্কোর কি আমার ভবিষ্যৎ ওজন বলে দিতে পারে?
একজন মানুষের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্যভাবে নয়। পলিজেনিক স্কোর বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে গড় ঝুঁকির পার্থক্য দেখায়। উঁচু স্কোরের অনেকের স্থূলতা হয় না, আর নিচু স্কোরের অনেকের হয়।
জিনের ভূমিকা থাকলে কি খাবার আর ব্যায়ামের কোনো মূল্য নেই?
অবশ্যই আছে। কত সহজে ওজন বাড়ে আর কতটা খিদে লাগে, তার ওপর জিন প্রভাব ফেলে, কিন্তু পরিবেশ আর অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক সক্রিয়তা আর ভালো ঘুম যেকোনো ওজনে, যেকোনো জিন নিয়েই আপনার স্বাস্থ্যের উপকার করে।
তথ্যসূত্র
- Elks CE et al. – Variability in the heritability of body mass index: a systematic review and meta-regression, Frontiers in Endocrinology (2012) (ইংরেজিতে)
- Hainer V et al. – Melanocortin pathways: suppressed and stimulated melanocortin-4 receptor (MC4R), Physiological Research (2020) (ইংরেজিতে)
- Salum KCR et al. – When leptin is not there: a review of what nonsyndromic monogenic obesity cases tell us and the benefits of exogenous leptin, Frontiers in Endocrinology (2021) (ইংরেজিতে)
- Broad Institute – Calculating genetic risk for obesity (Khera et al., Cell, 2019) (ইংরেজিতে)
- Sumithran P et al. – Long-term persistence of hormonal adaptations to weight loss, New England Journal of Medicine (2011) (ইংরেজিতে)
- Fothergill E et al. – Persistent metabolic adaptation 6 years after The Biggest Loser competition, Obesity (2016) (ইংরেজিতে)
